স্মৃতির ঝুড়ি থেকে : গ্রামের কয়েকটা ভিন্ন ধরনের বিয়ে

Dr. Abdur Rabb

Published in the Jogajog on December 10, 2010

+(reset)-

You may also read this in bangladeshis abroad.wordpress.com

বাংলাদেশের নাম বললেই মনে পড়ে সে দেশের গ্রামের কথা |  বেশির ভাগ বাঙালী  বাস করেন  গ্রামে | গ্রামের জীবনযাত্রাও শহরের জীবনযাত্রা থেকে অনেকটা ভিন্ন | বাঙালি ভাই বোনেরা যারা বিদেশে আছেন তাদের অনেকেরই হয়ত গ্রাম সম্বন্ধে খুব ভাল  জ্ঞান নাই | আমাদের নতুন প্রজন্মের তো কথাই  নাই | তা ছাড়া  গ্রামের লোকেরা তাদের নিজেদের সম্বন্ধে কিছু লেখেননা | লেখতে পারেননা | তাদের বেশির ভাগ লোকই গরিব  ও অশিক্ষিত |  তারা বঞ্চিত ও অবহেলিত | তাদের কিছু বলার নাই | কেইবা শোনবে তাদের কথা ! আমি তাদেরই একজন ছিলাম |  কি যেন একটা হয়ে গেল ! আমি লেখাপড়া শিখলাম  | এটা কেমন করে সম্ভব হল তা আমি নিজেও সঠিক বুঝে উঠতে পারিনা  | আমি মনে করি  এটা আল্লার একটা বিশেষ কেরামত |  আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন  কথা বলা ও লেখার কিছুটা জ্ঞান | তাই আমি চেষ্টা করছি গ্রামের জীবন সম্বন্ধে কিছু কথা লিখতে | আমার অভিজ্ঞতার বর্ণনা থেকে আপনারা যদি ১৯৪০ আর ১৯৫০ দশকে বরিশালের গ্রাম সম্বন্ধে কিছু জানতে পারেন তাহলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব |

এর আগে ১৯৫০ সালের একটা বীভত্স  রাতের কথা লিখেছিলাম | এবার বলি ১৯৪০ দশকের  বরিশাল  গ্রামের কয়েকটা  ভিন্ন ধরনের বিয়ের কথা | প্রথমেই বলে রাখি যে আমি যে বিয়েগুলোর কথা লিখব বরিশালের সব বিয়েই যে সেই একই রকম তা নয় | আমার বাছা বিয়েগুলো অসাধারনই বলতে হবে | আশা করি এই বিয়েগুলোর গল্প শুনতে পাঠকদের ভাল  লাগবে |

বরিশালের গ্রামগঞ্জে বেশীর  ভাগ বিয়েতে   ছোটখাটো ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকত |  অতিথিদের  খাওয়া দাওয়া অথবা আদর অভ্যর্থনা ঠিক মত না হলে রাগারাগী হত | বেশীরভাগ  সময় ঝগড়া হত কন্যার কাপড়চোপড় ও গহনাপাতি নিয়ে | বরযাত্রীর খাওয়া দাওয়া শেষ হলে বরপক্ষের আনা জিনিসপত্র কন্যার পক্ষের লোকদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া হত | এই সময় যদি কন্যার পক্ষের লোকেরা জিনিস পত্র নিয়ে কোন কূমন্তব্য করতেন, তাহলে বর পক্ষের লোকেরাও গালি গালাজ শুরু করতেন | এই কথা কাটাকাটি ও গালি গালাজ কখনো  কখনো মারামারিতে পরিণত হত |  এক বিয়েতে মারামারির ফলে দুজন লোকের মাথা ফেটে গিয়েছিল | তখন একজন বলেছিলেন, “ বিয়েতে যদি দু’এক জনের  মাথা না ফাটে বা ঠ্যাং না ভাঙ্গে,  তাহলে সেটা  বিয়ে হল নাকি ? ”

আমাদের শ্রদ্ধেয় ভাই প্রফেসর আবুল আলমের লেখায় পরেছি বিয়ের অনুষ্ঠানে ঝগড়াঝাটির দুটো ঘটনা | প্রফেসর আলমের বাড়িও বরিশালের এক গ্রামে | ওনার বাড়ি আমার বাড়ি থেকে চৌদ্দ পোনারো মাইল দূরে | উনি লিখেছেন যে এক বিয়েতে খাওয়া দাওয়ার সময় হয়েছিল ভীষণ ঝগড়া | বর পক্ষের লোকদের খাওয়াচ্ছিলেন কনে পক্ষের লোকেরা | কনের পক্ষের এক ভদ্রলোক যখন খাবার দিচ্ছিলেন তখন বর পক্ষের এক অতিথি সেই খাবার বাম হাত দিয়ে নিলেন | এতে কনের পক্ষের ভদ্রলোক অপমানিত বোথ করলেন এবং রেগে গেলেন | তখন অতিথি রেগে বললেন, “তোদের যা  খাবার তা কি আবার ডান হাত দিয়ে নিতে হয় নাকি !” এর পর শুরু হলো কুরুক্ষেত্র | অবস্থা সীমার বাইরে যাওয়ার আগে অতিথি তার শার্টটা খুলে দেখালেন যে তার ডান হাত ছিলনা | একদিন নদীতে গরু গোসল করাবার সময় একটা কুমির ওনার  ডান হাথ ধড়ে ওনাকে গভীর পানিতে নিয়ে যাচ্ছিল | উনি তখন কুমিরের এক চোখে ওনার বা’হাতের আঙ্গুলগুলো ঢুকিয়ে দেন | কুমির চোখে ব্যাথা পেয়ে ওনাকে ছেড়ে দেয়, কিন্তু কুমির ওনার ডান হাতখানা কেটে নিয়ে যায় | বলা বাহুল্য, ওনার ডান হাত নাই দেখে ঝগড়াঝাটি বন্ধ হয়ে যায় |

দ্বিতীয় ঘটনা  ঘটেছিল আর একটা বিয়ের বাড়িতে | কোনো এক বিষয় নিয়ে বর পক্ষ ও কন্যা পক্ষের ভেতর ভীষণ  ঝগড়া |এর ভেতর এক ভদ্রলোক অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন | তখন সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল | ঝগড়াঝাটি বন্ধ  হয়ে গেল | কিছুক্ষণ পড়ে উনি  চোখ খোললেন এবং হাসি দিয়ে উঠে দাড়ালেন | সবার মুখে তখন হাসি ফুটল | উনি ছিলেন একজন বদ্ধিমান মানুষ | উনি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভান করেছিলেন ঝগড়া থামাবার জন্যই |

বরযাত্রীর আগমন, খাওয়া দাওয়া এবং বিয়ের অনুষ্ঠানটা যে সময় মত হতনা তা বলা বাহুল্য | দু’চার ঘন্টা দেরী করে এই কাজগুলো শুরু করা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল | কখনো  দেখেছি যে রাত সাতটায় বরযাত্রীর রওয়ানা দেওয়ার কথা  থাকলেও তাদের পক্ষের অনেকেই রাত দশটার আগে হাট থেকেই  ফিরতনা  | তাদের জুতা ছিলনা | গ্রামের মানুষরা সাধারণত জুতা পরতনা | এর সব চাইতে বড় কারণ ছিল যে তাদের জুতা ছিলনা  | তবে বিয়ের বাড়িতে জুতা পরে না গেলে কেমন করে চলবে | তাই তারা হাটে গিয়েছিলেন জুতা কিনতে | আমিও প্রথম জুতা পরেছি যখন আমার বয়স ১৫ | আমার গ্রাম ছেড়ে নানা বাড়ি যাওয়ার পর নানা আমাকে একজোড়া রাবারের জুতা কিনে দিয়েছিলেন | আমাদের কাশিপুর হাই স্কুলে একদিন এক হিন্দু ছাত্র জুতা পরে ক্লাসে এসেছিল | অন্যান্য ছাত্ররা এ নিয়ে অনেক হাসি ঠাট্টা করেছে |  যাই হোক,  গ্রামের লোকেরা জুতা হাতে করে খালি পায় বিয়ের বাড়ি হেটে যেতেন | এর কারণ ছিল দু টা | প্রথমত:, জুতা পরে বেশি হাটলে জুতার নিচের সোল ক্ষয় হয়ে  যাবে | এই একজোড়া জুতা দিয়েই চালাতে হবে অনেক বছর |  দিতীয়ত:, কন্যার বাড়ি যেতে হবে হয়ত চাষ করা জমির ভেতর দিয়ে, কাদা রাস্তা দিয়ে অথবা এক হাটু পানির ভেতর দিয়ে | তাই অতিথিরা  তাদের জুতা হাতে করে নিয়ে কন্যার বাড়ির কাছে পুকুরে, খালে, অথবা নদীতে পা ধুয়ে জুতা পরে নিতেন  |

এই প্রসঙ্গে আমি আরও একটা কথা বলি | গ্রামের লোকদের, বিশেষ করে পুরুষদের ,  পা অত্যন্ত চওড়া | তারা যেহেতু জুতা পরেনা এবং পুরুষরা ঘন্টার পর ঘন্টা চাষ করা জমিতে বড় বড় চাকার  উপর হাটেন ,  তাদের পা অসাধারণ ভাবে  চওরা হয়ে যায় | ফলে অনেক সময় তাদের পায়ের জুতা কিনতে পাওয়াও খুব কষ্ট হয় |

এক বিয়েতে আমি বরযাত্রীর অংশ হিসাবে গিয়েছিলাম | কন্যার বাড়ি ছিল অনেক দূরে একটা নদীর পারে |  আমরা সেখানে গেলাম জলপথে | আমরা  সারা  রাত  ছোট ছোট নৌকায় শুয়ে বসে কাটালাম | ভোর সাতটা আটটার সময় কন্যার বাড়ি থেকে কয়েক শ’ গজ দূরে একটা খালে আমাদের নৌকা ভিড়ল  | ঘটক সাহেব কন্যা পক্ষের লোকদের আমাদের আগমনের কথা জানালেন |  কিন্তু  তারা আমাদের অভ্যর্থনা করতে আসলেন না | ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা খালের পারে বসে রইলাম | দুপুর হল | কোন লোকের চিন্হ দেখলামনা | আমরা সারা রাত না খেয়ে ছিলাম | সেই  রাতের পরেও অর্থেক দিন চলে গেল | আমরা ক্ষুদায় অত্যন্ত  কাতর হয়ে পরলাম  | আমাদের জন্য কন্যা পক্ষের বাড়ি যাওয়াও সম্ভব ছিলনা | আমরা কোন রকমই চাইনি যে আমাদের মান সন্মানের উপর আঘাত লাগুক | আমাদের আহ্বান করে না নিলে আমাদের সে বাড়িতে যাওয়া সম্ভব ছিলনা | দু’চার মাইলের ভেতর কোন দোকান পাট ও ছিলনা | কোন উপায় না দেখে চলে গেলাম কন্যার বাড়ী থেকে দূরে এক বাড়িতে | আমাদের দুরবস্থা দেখে সে বাড়ির লোকেরা আমাদেরকে নারকেল আর মুড়ি খেতে দিলেন | আমদের ক্ষিদের কষ্টটা কিছুটা লাঘব হল |  বিকেল তিনটা চারটার দিকে কন্যার “মাতব্বর” আত্মীয় স্বজন (তাদের পদবি ছিল মাতব্বর) আমাদেরকে স্বাগত জানাতে আসলেন | তাদের বাড়িতে পৌছার পর প্রথমে আক্ত হল, তারপরে খাওয়া দাওয়া | নৌকাগুলো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল | মাঘরেবের নামাজ শেষ করে আমরা বউ নিয়ে নৌকায় চড়ে রওয়ানা দিলাম | যখন আমরা বরের বাড়ী পৌছলাম তখন আকাশের পূর্ব দিক পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল | চারদিক থেকে আসছিল মুয়াজ্জিনের কন্ঠ | মাঝে মাঝে মোরগের ডাকও শোনা যাচ্ছিল |

এবার আসি  দিতীয় বিয়ের গল্পে | এ বিয়ে হয়েছিল আমাদের বাড়িতেই | আমার দূর সম্পর্কের চাচা বিয়ে করলেন পাশের গ্রামে | চাচা ছিলেন ক্লাস ফোর পাশ | তিনি একটা ছোট  চাকরি করতেন বরিশাল শহরে | উনি অনেক উপন্যাস পড়তেন ও সিনেমা দেখতেন | উনি স্বপ্ন দেখতেন একজন ফিল্ম অভিনেত্রীর মত কোনো সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করা | স্বপ্ন এক কথা আর বাস্তব আর এক কথা | একদিন তাকে খবর দাওয়া হলো যে তার পরের দিন ওনার বিয়ে | যিনি এই খবর নিয়ে গেলেন  তিনি ওনাকে পরের দিন বাড়ি আসতে বললেন | কোথায়  কাকে বিয়ে করবেন এ সম্বন্ধে চাচার  কোন ধারণা ছিলনা | গ্রামের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে আমরা সবাই বরযাত্রীর পক্ষ মেয়ের বাবার বাড়ী গেলাম | পাত্রও আমাদের সাথে গেলেন | বিয়ে হলো | খাওয়া দাওয়ার পর সেই রাতেই আমরা নতুন  বউ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম | তখন আমার বয়স ছিল ১৩ বছর |

আমাদের দেশে, বিশেষ করে গ্রামে,  তখনকার দিনে এই রকমই বিয়ে হত  | বাবা মা আত্মীয় স্বজনরা বিয়ে ঠিক করতেন আর বর এবং কন্যা এটা স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিত | বেশির ভাগ সময়ই বাসর ঘরে বর কন্যার প্রথম দেখা হত |  বাসর ঘরে নাকি স্বামীই প্রথমে কথা বলা শুরু করত | ক্যানাডার মত জায়গা হলে হয়ত স্বামী আবহাওয়ার প্রসঙ্গ নিয়ে কথা শুরু করত | বাংলাদেশের স্বামীরা বৌকে  জিগ্গেস করত : “তোমার নাম কি ?” | যাই হোক, আমদের বেশির ভাগ বিয়েগুলোই টিকতো | পশ্চিম দেশে মানুষ প্রথম প্রেমে পরে এবং পরে তারা  বিয়ে করে | এখনও  বাংলাদেশের  গ্রামগঞ্জে বেশির ভাগ মানুষ প্রথমে বিয়ে করে এবং পরে হয়তবা স্বামী স্ত্রী একজন আর একজনকে ভালবাসে |  তবে একটা কথা সত্য  যে পশ্চিম দেশের তুলনায় আমাদের দেশে ডিভোর্সের হার অনেক কম |

আমাদের আশা ছিল যে চাচা তার স্ত্রীকে পেয়ে খুশি হবেন | কিন্তু  তা হলনা | চাচার মতে নতুন বউ  দেখতে,  বুদ্ধিতে বা কাজকর্মে  কোন রকমই ওনার স্বপ্নের ফিল্ম স্টার  বৌএর কাছা কাছিও না | চাচা এতে খুব মনক্ষুন্ন হয়ে পড়লেন | বিয়ের কয়েকদিনের ভেতর উনি পাগল হয়ে গেলেন | ঘুম ছিলনা,  আর সব সময় আবোল তাবোল বলতেন | ওনাকে বাঁচিয়ে রাখাই ছিল একটা বড় সমস্যা | ওনাকে আমরা শিকল দিয়ে গাছের সাথে বেধে রাখতাম | আমাদের ভয় ছিল যে ছাড়া পেলেই উনি পুকুরে ঝাপ দিয়ে মরবেন | ওনাকে ভাত খাওয়াতে খুব কষ্ট হত | আমরা তিন চার জন লোক  ওনাকে ধরে চিত করে শুইয়ে ফেলতাম এবং চামচ দিয়ে জোরে খিল খাওয়া দাতগুলো খুলে গলার ভেতর খাবার ঢুকিয়ে দিতাম | এ ভাবে চলে গেল প্রায় এক বছর | কোন রকমই ওনার অবস্থার উন্নতি হলনা | ঐ সময় শুনলাম যে পশ্চিম বঙ্গে চব্বিশ পরগনায় এক সাধক স্বপ্নে একটা পাগলামির ঔষধ পেয়েছে, এবং সেই ঔষধে অনেকের পাগলামি ভাল হয়ে গিয়েছে | এখন কথা হলো, সেই ঔষধ কেমন করে আনা যাবে | তখনকার দিনে বর্ডার পেরিয়ে ইন্ডিয়ায় যাওয়া ছিল অত্যন্ত কষ্ট | তবুও আমাদের  এক হিন্দু ভাইর সাহায্যে আনা হল সেই ঔষধ | ঔষধটা ছিল একটা গাছের শেকর | আমরা সেই শেকরগুলো পাটা পুতায় পিষে নরম গোল্লার মত করে নিলাম এবং সেগুলো চাচাকে খাইয়ে দিলাম | কিছুক্ষণের ভেতর চাচা ঘুমিয়ে পড়লেন | উনি দুই রাত দুই দিন ঘুমালেন | ঘুমের মধ্যেও আমরা ওনাকে কিছু খাবার খাইয়ে দিতাম | ঘুম ভাঙ্গার পরে উনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ” আমি কোথায় ? আমার কি হয়েছে ?”

এর পর চাচা স্বাভাবিক ভাবে সংসার করলেন | ওনাদের আটটা দশটা ছেলে মেয়ে হল | ওনার আয়ের উপায় ছিল সেই ছোট্ট চাকরি | এখন থেকে কয়েক বছর  আগে আমি ওনার সাথে দেখা করলাম ওনার বরিশাল শহরের বাসায় | ওনাকে সহ ওনার পরিবারের একখানা ছবিও তোললাম | আমি দেখলাম যে ওনার মনের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ  | আমাকে প্রায় কেদে কেদে বললেন, “ দেখো রাব্ব, আমার দুটো মেয়ে বড় হয়েছে | ওদেরকে বিয়ে দিতে হবে | আমার অল্প বেতনের চাকরি | ওদেরকে বিয়ে দিতে অনেক টাকার দরকার | আমি কোথায় পাব এত  টাকা ?” আমি মন্ত্রিয়ালে ফিরে আসার  কিছুদিন পর খবর পেলাম যে চাচা আত্মহত্যা  করে মারা গেছেন |

এখন বলি আমাদের গ্রামের মেয়ে হাজেরা বিবির বিয়ের কথা |  হাজেরা বিবি হাজী বাড়ির মেয়ে | মানুষ মনে করত যে সে ছিল পরীর মত সুন্দরী | আসল ব্যাপারটা হল যে তার শরীরের  রং ছিল খুব ফর্সা | তখনকার দিনে কোন মেয়ের শরীরের রং ফর্সা হলেই  তাকে সুন্দরী বলা হত | হাজেরা  বিবির আরো একটা বিশেষ গুন ছিল |  উনি ছিলেন আমাদের গ্রামের সবচাইতে বেশি শিক্ষিতা মুসলমান  মেয়ে | উনি প্রথম মুসলমান মেয়ে যিনি প্রাইমারি স্কুল থেকে ক্লাস ফোর পাশ করেছিলেন | ওনার পরিবারও ছিল ভাল |   হাজী বাড়ির লোকদেরকে মানুষ সন্মান করত | আমদের গ্রামের পূব দিকের গ্রামে ছিল একটা ধনী ও দুর্দান্ত পরিবার | সেই পরিবারের পুরুষরা ধরাকে সরা মনে করতেন | তারা মনে করতেন যে তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারতেন | তাদের চোখ পড়ল হাজেরা বিবির উপর | তাদের ঘরে ছিল একটা বিবাহ যোগ্য ছেলে | সেই  পরিবারের লোকেরা ঠিক করলেন  তাদের ছেলের সাথে হাজেরা বিবির বিয়ে দেবেন  | ছেলের বাবা এবং চাচা বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসলেন হাজী বাড়ি | মেয়ের পক্ষ ও ছেলের পক্ষের লোকদের সাথে কিছুটা কথা কাটাকাটি হল | আমি শুনেছি যে মেয়ের চাচা ছেলের পক্ষের লোকদের কিছু কটু কথা শুনিয়েছিলেন | এতে ছেলের বাবা আর চাচা অপমানিত বোধ করলেন | এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তারা ঠিক করলেন যে হাজেরা বিবিকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে তাদের  ছেলের সাথে তাকে বিয়ে দেবে |  কোন তারিখে তারা দলবল নিয়ে মেয়েকে নিতে আসবেন তারা তাও জানিয়ে দিলেন  |

আমাদের গ্রামের লোকেরা জানলো যে হানাদার বাহিনীর সংখ্যা হবে একশ থেকে দেড়শ, এবং তাদের হাতে থাকবে ল্যাজা, সরকি, রামদা ও আরও অনেক রকমের হাতিয়ার | আমাদের গ্রামের প্রায় সমস্ত পুরুষরাও সেই একই  ভাবে তৈরী হলেন | যাদের ল্যাজা সরকি ছিলনা তারা নিলেন মাছ মারার কোচ ও ছাতির কাটার তৈরী ক্ষতনি |  এক অন্ধকার রাতে আসল সেই দুর্দান্ত সিন্তায়কারীরা | আমাদের গ্রামের পূর্ব  সীমানায়  ছিল একটা খাল | সেই খালের উপর ছিল একটা সরু  কাঠের পুল |   আমাদের গ্রামে আসতে হলে সবাইকে সেই পুলটা পার হয়ে আসতে হত |  আমরা কৌশল করলাম  সেই পুলটাকে রক্ষা করতে |  যে রাত্রে হানাদারদের আমাদের গ্রামে আসার কথা সে রাতটা ছিল অন্ধকার |  আমাদের মহিলারা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন | এই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কে বাঁচে কে মরে তা নিয়েই ছিল তাদের চিন্তা | আমিও  থর থর করে কাপছিলাম | তখন আমার বয়স ছিল নয় দশ বছর | আমাদের শত্রুরা আমাদের প্রস্তুতির কথা জানতে পারল | পুলের ওপারে এসে তারা বুঝতে পারল যে সুরক্ষিত পুল পেরিয়ে তাদের পক্ষে আমাদের গ্রামে ঢোকা সম্ভব ছিলনা | তাই তারা ধীরে ধীরে তাদের গ্রামে ফিরে গেল | আমাদের গ্রামের লোকেরা স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বাচলেন |

আমদের বাড়ির জয়্নাল সাহেব ছিলেন আমার আর একজন দূর সম্পর্কের চাচা | উনি ছিলেন কাশিপুর ইউনিয়নের মুসলমানদের ভেতর সবচাইতে বেশি শিক্ষিত | উনি ছিলেন তখনকার দিনের  আই.এসসি পাস  |  হাই স্কুল শেষ করে উনি বি. এম. কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে দুই বছর পড়েছেন | ওনার পড়ে আমিই  প্রথম পড়াশুনায় ওনার চাইতে কিছুটা বেশি এগিয়ে গিয়েছিলাম |  জয়নাল চাচার সাথে বিয়ে হল হাজেরা বিবির | ওনাদের সম্পর্ক  ছিল মামাত ফুফাত ভাই বোনের |  পরবর্তিতে জয়নাল চাচা সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে ফায়ার ব্রিগেডের ডিরেক্টর হয়েছিলেন|

আমার এক বন্ধু রহমান সাহেব বি. এ. পাশ করলেন | নাসির তালুকদার আমাদের পাশের গ্রামের লোক | তালুকদার পরিবারের ছেলে বলে ওনার খুব অহমিকা ছিল | উনি ছিলেন আমার আর রহমান সাহেবের বন্ধু |রহমান সাহেব এবং আমি দুজনেই লেখাপড়া শিখেছি | সেজন্যই তালুকদার সাহেব আমাদের সাথে বন্ধুত্ব করেছিলেন | তা নাহলে উনি আমাদের সাথে কথাও বলতেননা | রহমান সাহেব তালুকদার সাহেবের বোনের প্রেমে পরে গেলেন | তিনি চাইলেন বন্ধুর বোনকে  বিয়ে করতে | ঘটকের কাজটা করতে হলো আমাকে | এর পরে কি হলো তা বুঝতে হলে আমদের দুটো বিষয়  জানা দরকার | তখন  ছিল পাকিস্তানের সময় | রেলগাড়িতে চরে কোলকাতায় যেতে হলে আমাদের পাকিস্তানি ট্রেনে  যেতে হত ভারতের বর্ডার পর্য্যন্ত | যেহেতু আমাদের ট্রেন ভারতে যেতে পারতনা, বর্ডারের ওপার থেকে নিতে হত ভারতীয় ট্রেন | ধরুন পাকিস্তানি ট্রেন বর্ডার থেকে ঢাকার দিকে রওয়ানা হচ্ছে, আর ভারতীয় ট্রেন একই সময় কোলকাতার দিকে রওয়ানা হচ্ছে | আমরা দর্শনা বর্ডারের কথা বলছি | আর একটা বিষয় হলো যে তখকার দিনে যারা অসাধারণ ধনী আর বিলাসপ্রিয় ছিলেন , তাদের কেউ কেউ  নাকি তাদের কাপড়চোপড় সাদা ধবধবে করার জন্য প্যারিসে পাঠাতেন | সেখানে নাকি তাদের কাপড়চোপড় ব্লিস দিয়ে মেশিনে ধোয়া হত | টাকা থাকলে টাকা ব্যায় করার জায়গাও দরকার |আমার এই ছোট্ট জীবনে দেখেছি অনেক টাকার খেলা |

রহমান সাহেব ছিলেন খাটো আর ওনার গায়ের রং ছিল কালো | তালুকদার সাহেবকে এই বিয়ের সম্বন্ধের কথা বলার সাথে সাথে উনি আমাকে বললেন, ”রহমান সাহেব যদি আমার বোনকে বিয়ে করতে চান তাহলে ওনাকে দুটো কাজ করতে হবে | প্রথমত:, ওনাকে দর্শনায় যেতে হবে | সেখানে গিয়ে ওনার পা দুটো বাঁধতে হবে কোলকাতাগামী ট্রেনের সাথে আর মাথাটা বাঁধতে হবে ঢাকাগামী ট্রেনের সাথে | এই দুইটা ট্রেন যখন ছেড়ে দিয়ে বিপরীত দিকে চলবে তখন যেন উনি শরীরটাকে টানা দিয়ে একটু লম্বা হয়ে আসেন | ওনার দ্বিতীয় কাজ হলো যে ওনাকে প্যারিসে যেতে হবে | সেখানে ওনার শরীরটাকে ব্লিস দিয়ে মেশিনে ধুয়ে চামড়াটাকে ফর্সা করে আনতে হবে |” বলা বাহুল্য, আমার বন্ধু রহমান সাহেবের প্রেমের শেষ সেখানে |

 

This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Comments are closed.