স্মৃতির ঝুড়ি থেকে : যে রাতে জ্বলেছিল দোজখের আগুন

Dr. Abdur Rabb

Published in the Jogajog on November 26, 2010

+(reset)-

You may also read this in bangladeshis abroad.wordpress.com

সেই রাতে যেদিকে তাকিয়েছিলাম  সেদিকেই দেখেছি আগুন | মনে হচ্ছিল যে সমস্ত দুনিয়াটা আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে |

তখন আমার বয়স ১৪ বছর | কাশিপুর হাই স্কুলে ক্লাশ নাইনএ পড়ছি | সেই স্কুলে প্রায় সব ছাত্র ও শিক্ষকরাই ছিলেন হিন্দু | আমরা  মুসলমান ছাত্র মাত্র কয়েকজন | মৌলভি সাহেব আরবি পড়াতেন | তিনিই ছিলেন একমাত্র মুসলমান শিক্ষক | কাশিপুর ইউনিয়নে শতকরা আশি ভাগের বেশি লোক ছিলেন হিন্দু | এই  ইঊনিয়নের পশ্চিম সীমান্তে আমাদের ছোট্ট গ্রাম চহঠা | এখানেও বেশিরভাগ লোক ছিলেন হিন্দু | কাশিপুর ইউনিয়নে হিন্দু  মুসলমানরা শান্তিতে বাস করতেন | তাদের ভেতর ছিল হৃদ্যতা আর ভালবাসা | ১৯৪৭ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অনেক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে, কিন্তু এই দাঙ্গা কাশিপুরের লোকদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি | তবে গর্ব করে সে কথা বলার সুযোগ আর নাই | ১৯৫০ সালের এক রাতে আসল সেই দোজখের আগুন | যে না দেখেছে তাকে বুঝানো যাবেনা দুনিয়ার সেই বিভতস চেহারা | সেই রাতটা থাকার কথা ছিল অন্ধকার; কিন্তু যেদিকে তাকাতাম সেদিকেই দেখতাম রক্তরাঙ্গা আকাশ |

রাত ৯টা ১০টা বাজতেই আসা আরম্ভ হল আমাদের বাড়ির দুই দিক থেকে বোমা ফাটার মত শব্দ | হিন্দুদের বাড়িগুলো ছিল আমাদের বাড়ির পশ্চিম ও উত্তর দিকে | আমাদের গ্রামের বাইরে থেকে দুর্বৃত্তরা এসে হিন্দুদের সমস্ত বাড়িগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল | বাশগুলো পোড়ার সময় এবং ছাদের টিনগুলো ধ্বসে  পড়ে যাওয়ার সময় একটা বিকট আওয়াজ হত | ছোট ছেলে মেয়েরা ভয়ে কাপছিল | আমরা সবাই জোরে জোরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহপড়ছিলাম | ইতিমধ্যে আমাদের গ্রামের হিন্দু ভাই বোনেরা আমাদের পাড়ার মুসলমানদের বাড়িতে আশ্রয় নিল | আমরা কিছু হিন্দু লোককে লুকিয়ে রাখলাম ঘরের কারের উপর, আর অন্যদেরকে বাড়ির পাশে জঙ্গলের ভেতর | আমাদের শ্রদ্ধেয় শশী ভূষন সিংহ মহোদয় ও তার পরিবারকে রাখলাম আমাদের ঘড়ে | আমাদের গ্রামের কবিরাজ মহোদয়ের বয়স ছিল অনেক | উনি হাটাচলা করতে পারতেননা | তাই ওনাকে লুকাতে আমাদের কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল | আমাদের ঘড়ের কাছে ছিল একটা গর্ত | সেই গর্তের পাশেই মাটিতে শোয়ানো ছিল  একখানা খড়ের চাল | আমি এবং আমার বন্ধু ওহাব আলী দুজনে কবিরাজ বাবুকে কোলে করে নিয়ে সেই গর্তের ভেতর বসিয়ে দিলাম এবং চালখানা দিয়ে গর্তটা ঢেকে দিলাম | আমাদের ভয় হচ্ছিল যে দুর্বিত্তরা আমাদের হিন্দু ভাই বোনদেরকে মেরে ফেলবে |

আমরা সারা রাত জেগে থেকে হিন্দু ভাই বোনদেরকে পাহারা দিলাম | একটা রাত যেন দশটা রাতের মত লম্বা মনে হচ্ছিল | পরদিন ভোরে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল | কিন্তু তখনও চার দিকে থমথমে ভাব | কার ভাগ্যে কি ছিল তা কেউই জানতনা | আমাদের ভয় ছিল অন্য গ্রামের দুর্বৃত্তরা আমাদের গ্রামে এসে হানা দিতে পারে | আমরা শুনেছিলাম যে হিন্দুদেরকে যারা আশ্রয় দিত তাদেরকেও দুর্বৃত্তরা মেরে ফেলত | আব্দুল আলী, আব্দুর রশিদ, এবং হাশেম আলী ছিলেন আমার চাইতে বয়সে বড় | তারা অন্যান্য যুবকদের নিয়ে ঠিক করলেন যে জীবন দিয়েও তারা হিন্দুদের জীবন রক্ষা করবেন | তারা ল্যাজা সুরকি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলেন | আমরা ছোটরাও তাদের সাথে যোগ দিলাম | দুপুরের পরে আমি দেখি যে কয়েকটা লোক আমাদের উত্তর দিকের বাড়ির আজাহারের ঘড়ে রামদা হাতে নিয়ে দৌড়া দৌড়ি করছে | তারা সেই ঘরে হিন্দুদেরকে খুজছিল | ভাগ্যিস সেই বাড়িতে কোন হিন্দু আশ্রয় নিয়েছিলনা | আমি দৌড়িয়ে এসে আব্দুল আলী চাচাকে খবরটা দিলাম | উনি সেই খবর শুনে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়লেন এবং আবোল তাবোল বলতে শুরু করলেন | মনে হচ্ছিল যে উনি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছেন | উনি ল্যাজা হাতে উত্তরের বাড়ির দিকে রওয়ানা করতে উদ্যোগ করলেন | ওনার অবস্থা দেখে আমরা সবাই ভয় পেয়ে গেলাম | ইতিমদ্ধ্যে আমাদেরই এক ভাই খবর নিয়ে আসলেন যে আমাদের প্রস্তুতির কথা শুনে দুর্বৃত্তেরা আমাদের গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে | আমরা তখন স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বাচলাম | আব্দুল চাচাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসলেন | সেই দিন আর পরের রাত আমরা যেকোন অবস্থার মোকাবেলা করতে প্রস্তুত ছিলাম | আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল | সেই কষাইগুলো আর ফিরে আসেনি আমাদের গ্রামে | পরদিন ভোরে বরিশাল শহর থেকে আসল বেশ কয়েকজন পুলিশ | তারা আমাদের গ্রামের সমস্ত হিন্দু ভাই বোনদের এক জায়গায় একত্র করলেন | এর পর তাদেরকে লাইন করে দক্ষিন দিকের রাস্তা দিয়ে বরিশাল শহরে নিয়ে গেলেন | অনেক লম্বা লাইন | লাইনের সামনে ছিল কযেকজন পুলিশ , আর পেছনে কয়েকজন | আমি সেই রাস্তার পাশে মাঠে দাড়িয়ে দেখছিলাম কাকিমা, পিসিমা, শশী বাবু, সুদির দাস, ঝুনটু এবং এবং আরো অনেক বন্ধুবান্ধবদেরকে সেই চলন্ত লাইনের ভেতর | ওনাদেরকে যেতে দেখে আমি হাউ মাউ করে কাদছিলাম | জানিনা ওনরা আমার কান্নার শব্দ শুনতে পেরেছিলেন কিনা | পরে শুনেছি যে জীবনের নিরাপত্তার জন্য ওনাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বরিশাল শহরের একটা ক্যাম্পে |

পর দিন আমি এবং ওহাব আলী হিন্দু পারায় গিয়ে দেখি যে সব বাড়িগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে | টিন এবং খরের ঘড় একটাও দাড়িয়ে ছিলনা | পাকা দালানগুলোর ভেতরে আগুন দিয়ে আসবাবপত্র এবং কাঠের যা কিছু ছিল তা পুড়িয়ে দাওয়া হয়েছিল | বাড়ি ফেরার সময় আমি একটা ছোট্ট লাঠির মত পোড়া লোহার শিক পথ থেকে কুড়িয়ে  এনেছিলাম | আমার হাথে শিকটা দেখে আমার বাবা খুব রাগ করলেন | তিনি সেই শিকটা যেখান থেকে এনেছিলাম ঠিক সেখানে রেখে আসার আদেশ দিলেন | বাবার আদেশ আমি কখনো অমান্য করেনি | সেই মুহুর্তেই দাসের বাড়ি গিয়ে রেখে আসলাম সেই শিকটা |

আমি পরে জেনেছি যে আমাদের কাশীপুর ইউনিয়নের প্রায় সমস্ত হিন্দুরাই গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন | আমাদের কাশিপুর হাই স্কুলের হেড মাস্টার সারদা বাবুর পেটে ছুরি মেরেছিল কোন এক শয়তান | আমাদের স্কুলগুলো সব বন্ধ হয়ে গেল | এর সাথে শেষ হয়ে গেল আমার পরাশুনা | মাঠে চাষাবাদের কাজ করার ফাকে কোনরকম বাড়ির কাছের স্কুলে ক্লাস করতাম | সেই স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে আমার যে আবার পড়াশুনা হবে তা আমি কখনো ভাবিনি | এর পর আমার পড়াশুনার ব্যাপারে কি হল তা অন্য সময় বলব |

হিন্দু ভাই বোনদের প্রায় সবাই চলে গেলেন কোলকাতায় | ওনাদের সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ ছিলনা | পাকিস্তানের আমলে আমাদের পক্ষে কোলকাতা যাওয়া ছিল অসম্ভব | ২৮ বছর পরে ১৯৭৮ সালে আমি যখন ক্যানাডায় অধ্যাপনা করি তখন গেলাম কোলকাতায় | সেখানে গিয়ে আমি একজন একজন করে আমাদের গ্রামের অনেক হিন্দু ভাই বোনদের খুঁজে বের করলাম | তাদের অনেকেরই ছিল আর্থিক স্বচ্ছলতা | আমাকে পেয়ে তারা যা খুশি হয়েছিলেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না | আমিও যেন আমার হারানো ভাই বোনদেরকে ফিরিয়ে পেয়েছিলাম | ১৯৭৮ সালের পর থেকে আমি যখনই বাংলাদেশে গিয়েছি তখনই কোলকাতা গিয়ে তাদের সাথে দেখা করে এসেছি | তারা রব-দাকে প্রাণ দিয়ে ভাল বাসে | আমিও তাদেরকে অন্তর দিয়ে ভালবাসি | গড়িয়ার হাট এলাকায় থাকে দোলন ও পাখি | তারা দুই বোন বিয়ে করেছে দুই ভাইকে | দোলন মনে করে যে আগের জন্মে আমি তার একই মায়ের-পেটের ভাই ছিলাম | আমিও ওদের দুই বোনকে নিজের বোনের মতই ভালবাসি |


This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Comments are closed.